যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন; তা সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তাদের মাঝে পাপ-পূণ্যের ধারণাটি বিদ্যমান। সকল ধর্মেই  শিশুকাল থেকে সন্তানকে পাপ-পূণ্যের ধারণা দেয়া হয়ে থাকে। তবে এটি ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত শিশুটির মাঝে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম যতক্ষণ পর্যন্ত সে বালেগ না হয়ে ওঠে। বস্তুতঃ বালেগ হওয়ার পর থেকে তার মাঝে অধিকতর গুরুত্ব পায় পাপ-পূণ্যের থেকে আপন স্বার্থ। আর যারা ধর্মীয়ভাবে অন্ধ বিশ্বাসে অটুট তাদের বিষয়টা ভিন্ন। মূলতঃ বেহেস্ত-দোযখ কিংবা স্বর্গ-নরক তথা মৃত্যুর পরবর্তী স্তরে ভালো থাকা-মন্দ থাকার প্যারামিটার হিসেবে পূণ্য এবং পাপকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু ঠিক কী পরিমাণ পূণ্য অর্জন করলে বেহেস্ত/স্বর্গ লাভ তথা মৃত্যুর পরবর্তী সময়টা সুখময় কিংবা দুঃখময় হবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। পূণ্য করার একটা সব থেকে বড় সুবিধা হচ্ছে যদি মৃত্যুর পরে আরো একটি জীবদ্দশা থাকে তাহলে সেখানে পূণ্যবানরা নিঃসন্দেহে সুখময় জীবন পাবেন। আর যদি মৃত্যুর পরে আরো একটি জীবদ্দশা না থাকে তাহলেও তাদের কোনক্ষতি নেই। আমার এ লেখাটি মূলতঃ তাদের উদ্দেশ্যে লেখা যারা মৃত্যুর পরে আরো একটি জীবদ্দশা আছে বলে বিশ্বাস করেন।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেকোন ভালো কাজ করার মাধ্যমে পূণ্য এবং খারাপ কাজ করার মাধ্যমে পাপ অর্জিত হয়। তা সে মৃত্যুর পরে আরো একটি জীবদ্দশা আছে বলে স্বীকার করুণ আর নাই করুণ। যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন না, তারাও অনেক ভালো কাজ করে থাকেন তবে তার মাধ্যমে তারা পূণ্য অর্জনের কথা ভাবেন না, কেননা মৃত্যুর পরে পুনঃরুত্থানের বিষয়টি তাদের কাছে অর্থহীন। কিন্তু যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন তাদের কাছে পূণ্য অর্জন করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এদের মধ্যে যারা আপন ধর্মীয় বিশ্বাসে অটুট থেকে শতভাগ পাপ-পূণ্য বিচার বিবেচনা করে জীবন পরিচালনা করেন তারা ব্যতিক্রম। কিন্তু যারা কেবলমাত্র সওয়াব বা পূণ্য লাভের জন্য কাজ করেন; এটা পরকালে তথা মৃত্যুর পরবর্তী জীবদ্দশায় তাদের জন্য খুব একটা সহায়ক হবে বলে আমার মনে হয় না। কেননা, এদের কাছে কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদন করার গুরুত্বের চেয়ে বরং কাজটি করলে সওয়াব বা পূণ্য লাভ হবে এটাই বেশী গুরুত্ব বহন করে। মসজিদে প্রবেশ করেই দু’রাকাত (নফল) নামাজ আদায় করা অনেক সওয়াবের কাজ বলে আপনি যদি তরিঘরি করে (সময় না থাকায়) এক মিনিটের মধ্যেই দু’রাকাত নামাজ আদায় করে ফেলেন, তাতে আদৌ কোন সওয়াব বা পূণ্য লাভ হয় কি না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। ঠিক যেমনটি কেবলমাত্র লোক দেখানোর জন্য কোন ভালো কাজ করলেও সওয়াব বা পূণ্য লাভের কোন সম্ভাবনা থাকে না।

আপনি যদি সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকার করেন তাহলে আপনার কাজের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ, কোন ভালো কাজ করলে সৃষ্টিকর্তা খুশী হন, আর কোন খারাপ কাজ করলে সৃষ্টিকর্তা অখুশী হন, সেটা বিবেচনা করে কোন কাজ করা বা না করা। যদি আপনার কাজের মাধ্যমে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই খুশী থাকেন তাহলে পরকালে তথা মৃত্যুর পরবর্তী জীবদ্দশায় আপনার সুখময় জীবন সুনিশ্চিত। কিন্তু আপনি যদি কোটি কোটি সওয়াবের কাজ করেন বা পূণ্য অর্জন করে থাকেন; আর সৃষ্টিকর্তা যদি আপনার প্রতি অখুশী থাকেন তাহলে পরকালে তথা মৃত্যুর পরবর্তী জীবদ্দশায় সৃষ্টিকর্তার দয়া ব্যতিত আপনার সুখময় জীবন লাভের কোনই সম্ভাবনা নাই। সুতরাং সওয়াব বা পূণ্য লাভের আশায় কোন কাজ করা কোনভাবেই কোন জ্ঞানী মানুষের কাজ হতে পারে না। জ্ঞানীরা কাজ করবেন নৈতিক দায়িত্ব থেকে সৃষ্টিকর্তাকে তুষ্ট করার লক্ষ্যে কাজটি করার মাধ্যমে নিজে তুষ্ট হওয়ার জন্য। উদাহরণ স্বরূপ, কোন অসহায়কে (অর্থ) সাহায্য করার ক্ষেত্রে সওয়াব বা পূণ্য লাভের কথা না ভেবে বরং ভাবা উচিৎ, অসহায়কে (অর্থ) সাহায্য করাটা সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ (সূরা যারিয়াত: ১৯, সূরা হাশর: ০৭) কিংবা এটি করা সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করেন তাই আমি অসহায়কে (অর্থ) সাহায্য করি এবং এটি করা আমার নৈতিক দায়িত্ব আর নৈতিক পালন করার মাধ্যমে আমি আত্মতুষ্টি লাভ করি।

আপনি মসজিদ/মন্দির/গির্জা/প্যাগোডা কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বানাতে চান? পূণ্য লাভের জন্য এটি করার চিন্তা করাটা অবান্তর বরং ভাবুন এটি করাটা আপনার নৈতিক/সামাজিক দায়িত্ব আর এটি করলে সৃষ্টিকর্তা খুশী হন। আপনার প্রতিটি কর্মই যদি হয় সৃষ্টিকর্তার খুশীর জন্য তাহলে সওয়াব বা পূণ্য নিয়ে ভাবার আবশ্যকতা কী? কাজেই জ্ঞানের চর্চা করুণ, ভালো কাজ করুণ, ভালো থাকুন। সওয়াব বা পূণ্যের পিছনে না ছুটে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির কথা ভেবে আপনার প্রতিটি কর্মকান্ড পরিচালনা করুণ। একটি সুন্দর ও সুখী সমাজ গঠনে সর্বদাই ভালো কাজ করুণ। পরকাল বলে কিছু থাক বা না থাক, বস্তুতঃ একজন মানুষ হিসেবে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে এটাই আপনার উপর অর্পিত দায়িত্ব।

লেখকঃ মোঃ আব্দুল হাই খান
ই-মেইলঃ haikhan2002@yahoo.com
তারিখঃ ০৭/০২/২০২৫

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *