কী আছে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফায়? অনেকবার জানার ইচ্ছা হয়েছে কিন্তু সুযোগ হয়নি। বস্তুতঃ তাদের ঘোষিত ৩১ দফায় কী আছে বা কী থাকতে পারে সেটা অনুধাবন করা খুব একটা কঠিন কিছু নয় তাই এ বিষয়ে জানার আগ্রহটা আসলে তেমন প্রবল ছিল না। অন্যদিকে তাদের ঘোষিত ৩১ দফা না দেখে তথা না পড়ে সে ব্যাপারে কোন মন্তব্য করাটাও অনুচিৎ। তাই পড়ে ফেললাম তাদের ঘোষিত সেই রাজনৈতিক সংস্কারের আত্মকাহিনী; কেবলমাত্র একবার নয় বরং একাধিকবার। অতঃপর তাদের ঘোষিত ৩১ দফা পড়ে আমি খুশি হতে না পারলেও অখুশি হইনি কারণ আমি জানি তাদের সংস্কারের প্রস্তাবনা এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু আমি এবং আমার মত এদেশের আপামর আমজনতা ঐসব তথাকথিত সংস্কার প্রস্তাবের ভাষা বোঝে না। কেননা এসকল বিষয়ে সাধারণ জনগণের কাছে দৃশ্যমান বলতে তেমন কিছুই পরিলক্ষিত হয় না। বস্তুতঃ যারা ইতোপূর্বে সরকার পরিচালনা করেছেন বা ভবিষ্যতে সরকার পরিচালনা করতে চান তাদের সংস্কার প্রস্তাবনা সাধারণত এমনই হয়ে থাকে। রাজনৈতিক সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া কাজেই রাষ্ট্রের সমসাময়িক পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তার আলোকে সময়ে সময়ে এসকল বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব আনয়ন ও বাস্তবায়ন করাটা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। কিন্তু দেশের আপামর আমজনতার কাছে সংস্কার মানে হলো এমন কিছু যা প্রত্যক্ষভাবে তারা চোখের সামনে দেখতে পায় এবং সরাসরি তার সুফল ভোগ করতে পারেন।

বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবের ১১ দফায় বলা হয়েছে, “মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করা হবে।” কিন্তু নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যখন একই যোগ্যতা সম্পন্ন বাছাইকৃত তিনজনের তালিকা থেকে একজনকে নির্বাচন করা হবে তখন তালিকার ৩য় অবস্থানে থাকা ব্যক্তিটি যখন এক বস্তা টাকাসহ সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কর্তা/ এমপি/ মন্ত্রী/ প্রধান মন্ত্রীর দপ্তরে কিংবা বাসায় গিয়ে হাজির হবেন তখন হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে দিয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কর্তা/ এমপি/ মন্ত্রী/ প্রধান মন্ত্রী কি ঐ ৩য় অবস্থানে থাকা ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তালিকার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিটিকেই চুড়ান্তভাবে নিয়োগ প্রদান করার মত সৎ সাহস দেখাবেন? বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার কোথাও এরুপ কোন ইঙ্গিত নেই। টাকা এমন এক যাদুকরী বস্তু তাই স্বেচ্ছায় যদি এটা ঘরে প্রবেশ করে তবে এটাকে পায়ে ঠেলে দেয়া একটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বাংলাদেশে বিশেষ করে যারা প্রশাসনের সাথে জড়িত তাদের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এমনটি ভাবা একটি হাস্যকর ব্যাপার। বরং তাদের বৈশিষ্ট্য এটাই যে, ৩য় অবস্থানে থাকা ব্যক্তিটি যদি নিজে থেকে এ ধরণের উদ্যোগ না নেন তাহলে প্রশাসনের পক্ষ থেকেই তাকে এব্যাপারে উৎসাহিত করা হবে।

বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবের ১৩ দফায় “দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না” বলা হলেও কীভাবে তা বাস্তবায়িত হবে তার কোন রূপরেখা ঘোষিত ৩১ দফার কোথাও পরিলক্ষিত হয়নি। বরং বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাতে দূর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলে এদেশের ৯০% রাজনৈতিক কর্মী মাঠ থেকে পালাবে। কারণ অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আয়ের মূল উৎসই হচ্ছে নিজে দূর্নীতি (চাঁদাবাজী) করা কিংবা প্রশাসনকে দূর্নীতি করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে অর্থ উপার্জন করা। এদেশে নিজ সমর্থিত দল ক্ষমতায় না থাকলে ঐ দলের ঠিকাদাররা কখনোই ঠিকাদারী কাজ পান না, আমাদের অতীত এটাই বলে। আর দলীয় ঠিকাদার কাজ নেয়ার পরে যখন ১ নং ইটের কাজ ৩ নং ইট দিয়ে করেন তখন তার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহসও কেউ দেখান না বা দেখালে তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। এগুলো সব অলিখিত বিষয় তাই সংস্কার প্রস্তাবের কোথাও এগুলোর ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত নাই এবং এগুলো কখনোই তাদের সংস্কার প্রস্তাবে সংযুক্ত হবে বলে আমার মনে হয় না। কেননা এগুলোই হচ্ছে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কাছে লক্ষ্মী; আর হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে দেয় কোন বোকায়?

বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবে যেটা গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো ক্ষমতা গ্রহণ ও ক্ষমতার পালা বদলের পদ্ধতি; আর নাগরিকরা পরোক্ষভাবে কিছুটা উপকৃত হবেন এমন কিছু বিষয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এদেশের আপামর আমজনতা দেশের তথা জনগণের পরোক্ষ কল্যাণের বিষয়ে মোটেও ওয়াকিবহাল নয়। তারা যা প্রত্যাশা করে সব সময়ই তারা তা দৃশ্যমান দেখতে চায়। আমজনতার চাওয়া-পাওয়া খুব একটা বেশী নয়; তবে যেটুকু তাদের চাওয়া তা আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে পূরণ করার কথা রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। কেননা, কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার পরে যে সোনার ডিম পাড়া হাঁস হাতে পেয়ে যান, কোনভাবেই সেটা তারা হাতছাড়া করতে রাজী নন। শেখ হাসিনার ভাষায় আমার বিরোধীতা না করে বরং (তোমাদেরকে সোনার ডিম পাড়া হাঁস দিলাম) দু’হাতে যত খুশী টাকা কামাও আর আমার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য যা যা করণীয় তাই তাই কর। হ্যাঁ অপ্রিয় হলেও এটাই আমাদের প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি। অথচ মাত্র কয়েকটি বিষয়ে সংস্কার নিশ্চিত করতে পারলেই আগামীতে যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন তাদের পক্ষে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষেই একটি সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। রাজনীতি যদি প্রকৃতপক্ষেই জনগণের কল্যাণের জন্যই করা হয় তাহলে নিচের বিষয়গুলোতে সংস্কার করার ক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিক দলেরই আপত্তি থাকার কথা নয়।

দফা-১: ঘুষ-দূর্নীতির ক্ষেত্রে ‘জিরো’ টলারেন্স ঘোষণা করা। এই লক্ষ্যে

(ক) সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুষ দাতা, ঘুষ গ্রহীতা (মন্ত্রী/এমপি/ আমলা যেই হোন না কেন) এবং এতদ্ব উভয়ের মাঝে সমন্বকারী (৩য় পক্ষ) সকল পক্ষের সর্বোচ্চ শাস্তির (ফাঁসি/যাবজ্জীবন) বিধান নিশ্চিত করে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা;

(খ) যেসকল মন্ত্রী/ এমপি/ আমলা উন্নয়ন মূলক কাজ না করেই কেবলমাত্র ভাউচার তৈরীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করবেন এবং বস্তা ভর্তি টাকার বিনিময়ে যারা কোন অপরাধীর অপরাধ ঢাকতে সহায়তা করবেন তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির (ফাঁসি/যাবজ্জীবন) বিধান নিশ্চিত করে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা (উদাহরণ: ট্রান্সকম গ্রুপের সিমিন রহমান এবং শেখ হাসিনা);

(গ) সিন্ডিকেট করে যে সকল ব্যবসায়ী পণ্যের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বাড়িয়ে দিয়ে জনজীবনে অশান্তি, অস্থিরতা ও অরাজকতা সৃষ্টি করবে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির (ফাঁসি/যাবজ্জীবন) বিধান নিশ্চিত করে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা;

(ঘ) কৃষক যে পণ্যটি ১০ টাকায় বিক্রয় করেন সেই পণ্যটি ঢাকায় আসতে আসতেই তার মূল্য ১০০ টাকা হওয়ার জন্য যারা সংশ্লিষ্ট থাকবেন তাদের জন্য শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা;

(ঙ) শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ এবং একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই শিক্ষর্থীর জন্য বছর বছর ভর্তি ফি/সেশন ফি-র নামে অভিভাবকদেরকে মোটা অংকের টাকা গুণতে বাধ্য করানোর মত অপসংস্কৃতি বন্ধ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

দফা-২: রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সকল ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সম অধিকার নিশ্চিত করা।

এই লক্ষ্যে ঠিকাদারী কাজ প্রাপ্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

দফা-৩: রাষ্ট্র থেকে চাঁদাবাজী সম্পূর্ণরূপে নির্মুল নিশ্চিত করা।

রোডে-হাটে-ঘাটে-মাঠে, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পুস্ট্যান্ড, থানা, অফিস-আদালত সহ রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে চাঁদাবাজী, জুলুম ও হয়রানী বন্ধ করার লক্ষ্যে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

ব্যাস! আমি মনে করি বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা নয় বরং আমার উল্লেখিত মাত্র তিনটি দফা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করলেই আমাদের আমজনতার বিচারে সংশ্লিষ্ট সেই সরকারটি হবে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ সরকার। কিন্তু ইতোপূর্বে যারা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন তারা পুনরায় ক্ষমতায় গেলে কোন ভাবেই এই তিনটি দফা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেবেন না। কারণ এ তিনটি দফা বাস্তবায়ন করা মানেই হচ্ছে জেনে বুঝে সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে মেরে ফেলা। পক্ষান্তরে যারা এখন পর্যন্ত ক্ষমতার স্বাদ নিতে পারেননি, যদি কাকতালীয়ভাবে তারা ক্ষমতার মসনদে বসার সুযোগ পান তাহলে তাদের জন্য এ তিনটি দফা শতভাগ বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে একটা অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপনের যথেষ্ট সুযোগ আছে বৈকি। এখন কেবল অপেক্ষার পালা, বাকীটা সময়ই বলে দেবে।

 
লেখকঃ মোঃ আব্দুল হাই খান
ই-মেইলঃ haikhan2002@yahoo.com
তারিখঃ ২১/০২/২০২৫

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *